বৈশাখের বাণিজ্য: দশ বছরে দশ গুণ
আবহমানকাল ধরেই বাঙালির নববর্ষ উৎসবের সঙ্গে বাণিজ্যের সম্পর্ক নিবিড়। এ উৎসবকে ঘিরেই ব্যবসায়ীরা পুরনো হিসাবের খাতা ফেলে নতুন খাতা খুলতেন। হালখাতা অনুষ্ঠানে ক্রেতারা যেমন সাধ্যমতো পাওনা পরিশোধ করতেন, আবার বিক্রেতারাও হাসিমুখেই মিষ্টিমুখ করাতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নববর্ষ উৎসবের ধরন পাল্টালেও বাণিজ্যের সম্পর্কটা এর সঙ্গে এখনো গভীরভাবে যুক্ত। বর্তমানে এই উৎসবকে ঘিরে যত ধরনের ব্যবসা হয় তার ৯৯ শতাংশই দেশীয় পণ্যের।
গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখছে নববর্ষের অর্থনীতি। সরকারি-বেসরকারি গবেষণা সংস্থা, ব্যবসায়ী সংস্থাগুলোর হিসাব পর্যালোচনা করলে এ ক্ষেত্রে অবাক করা পরিসংখ্যান বেরিয়ে আসে। দেখা যায় বৈশাখকে কেন্দ্র করে গত দশ বছরে বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ গুণেরও বেশি। ব্যবসায়ীদের তথ্য মতে, ২০০৭ সালে বৈশাখী বাজার যেখানে ৫০০ থেকে হাজার কোটির মধ্যে ছিল তা এখন ১২ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, দ্রুত বিকাশমান বৈশাখী অর্থনীতির ভালো দিকটি হলো, এতে তারল্য প্রবাহ বাড়ে, যা বছর শেষে সার্বিকভাবে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। আর ঝুঁকির দিকটি হলো মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, দেশীয় পোশাক খাতসহ গ্রামীণ অর্থনীতি বৈশাখী উৎসবকে কেন্দ্র করে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, এই বাজার ক্রমেই বড় হচ্ছে। এক দশক আগেও বাজার ছিল শত-কোটির ঘরে, বর্তমানে সেটা কয়েক হাজার কোটিতে পৌঁছেছে। সাবেক এই কর্মকর্তার সঙ্গে একমত পোষণ করে সংস্থাটির (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘টাকার অংকে বৈশাখী অর্থনীতি পরিমাপ করাটা মুশকিলের। সারা দেশের আনাচ-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনেক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের পণ্যসামগ্রী বিক্রি হয়। এসবের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যবসার আর্থিক পরিমাপটা একেবারে কম হবে না। তবে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো, এই উৎসবের বাজার ৯৯ শতাংশই দেশীয় পণ্যের বাজার।’
বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে পোশাক, প্রসাধনী সামগ্রী, খাদ্যপণ্য, উপহার সামগ্রী, ফুল, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, মুদ্রণ বা প্রকাশনা শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে বড় আকারের ব্যবসা হয়। বাংলাদেশ ফ্যাশন এনটারপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশন (এফইএ)-এর জরিপ মতে, দেশে ৫ থেকে ৬ হাজার বুটিক ও ফ্যাশন হাউস আছে। যারা বছরের সার্বিক বেচাকেনার ৩০ শতাংশ করে থাকে বৈশাখী উৎসবে। এফইএ-এর সভাপতি তাজহারুল হক বলেন, পোশাক খাতে ঈদের সময় ভারতীয় পোশাকের কদর থাকলেও এই সময় দেশীয় পোশাকের একক চাহিদা থাকে। বুটিক হাউসগুলো ঈদের পর সব থেকে বেশি ব্যবসা করে এই সময়। সংগঠনের (এফইএ) অর্থ পরিচালক (রং বাংলাদেশের কর্ণধার) সৌমিক দাশ জানান, ২০১৫ সালে বেচাকেনা হয়েছে আড়াই থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা। ২০১৬ সালে ৪-৫ হাজার কোটি টাকা আর গত বছরে ৬-৭ হাজার কোটি টাকা। এবার আশা করছেন ৮ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বেচাকেনা হবে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির (বিডিএমএস) তথ্য মতে, দেশে ছোট-বড় প্রায় ২৬ লাখ দোকান আছে। সমিতির সাবেক সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ২০১৬ সালে এক হিসাবে দেখা গেছে সব মিলিয়ে ৮ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে। তিনি জানান, ২০১০ সালে ১ থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছিল। এর ৩ বছরের ব্যবধানে ২০১৩ সালে ব্যবসা হয়েছে ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার। ২০১৫ সালে হয়েছে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা। আর গত বছর হয়েছে ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা। এবার সে হিসাবে ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকায় যাবে বলে আশা করছেন এই নেতা।
এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সাইফুল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, বাঙালির এই উৎসব ঘিরে কুটির শিল্পের বাজার ফুলেফেঁপে ওঠে। তিনি জানান, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার হিসাবে সারা দেশে সহস্রাধিক মেলা বসে। এসব মেলা একদিন থেকে শুরু করে মাসব্যাপী হয়ে থাকে। আদিবাসী অঞ্চল থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামীণ মেলার সার্বিক বাণিজ্যচিত্র অর্থের বিচারে ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা হওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
শহর অঞ্চলে এই দিনে ফুল বিক্রি হয় (গত বছরের হিসাবে) ৮/১০ কোটি টাকা। মুদ্রণ শিল্পের সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এ বছর নির্বাচনের বছর হওয়ায় ব্যবসা বেশি হবে। গত বছর যেখানে ১০/১২ কোটি টাকা ছিল এবার তা অর্ধশত কোটি টাকা ছাড়াবে। কাঁচাবাজার ও বেকারি পণ্য বিক্রিও বাড়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। সুইট মেনুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি মাধব চন্দ্র ঘোষ বলেন, সঠিক হিসাব নেই। তবে এসএসসি/এইচএসসির রেজাল্টের পরে সর্বোচ্চ বিক্রি হয় বৈশাখের প্রথম তিন দিনে।
বৈশাখী অর্থনীতি এখন নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। সরকার বৈশাখী উৎসবের ভাতা চালু করেছে। এবার সরকারি চাকরিজীবীর পাশাপাশি বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা উৎসবভাতা পাবেন। এ বিষয়ে মহিমাগঞ্জের মহিলা কলেজের শিক্ষিকা নাসরিন শিউলি জানান, এবার আমরা বেসিকের ২০ শতাংশ পাব। গত বছর পাইনি বলে যে কষ্ট ছিল তা আর থাকল না। এই শিক্ষিকা অনলাইনে তার মেয়ের জন্য দুটি জামা কিনেছেন। অনলাইন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ঢাকা স্টল ডট কমের পরিচালক মহিউদ্দিন তুষার জানান, সাশ্রয়ী, সহজ এবং সময় বাঁচাতে এবার সাধারণ মানুষ ভালোই আগ্রহ দেখাচ্ছে। সারা দেশে সব মিলিয়ে এই খাতে কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা হবে বলে ধারণা করছি।
উৎসবভাতা টাকার অঙ্কে খুব বেশি না হলেও মূল অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলেসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, রাজধানীর দামি শপিংমল থেকে ফুটপাত অথবা জেলা শহরের বিপণি বিতান, পার্কে, পাড়ায়, মহল্লায়, গ্রামগঞ্জের হাটবাজারে, মেলায় সবখানে অর্থনীতি চাঙ্গা দেখাবে।
সিপিডির এই গবেষক বৈশাখের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বলেন, সাধারণ মানুষের গণ্ডি পেরিয়ে উৎসবটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানেও মিশেছে। অনলাইন বা ই-কমার্স ব্যবসা বাড়ছে। ফলে বৈশাখী ব্যবসার পরিধি বাড়ছে বিস্ময়কর হারে।