৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন হবে না
আমি তেমন চিন্তিত নই। অতীতেও এ রকম সংকট সৃষ্টি হয়েছে, সেসব সংকট কেটেও গেছে। যেহেতু বিরোধী দলগুলো নির্বাচনের ব্যাপারে কিছু দাবিদাওয়া উত্থাপন করেছে এবং রাজপথে নেমেছে, অন্যদিকে সরকারেরও একটা অবস্থান আছে, সেহেতু এটা এক অর্থে রাজনৈতিক সংকটই বটে। তবে এ রকম রাজনৈতিক পরিস্থিতি অতীতেও সৃষ্টি হয়েছে এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সেসব পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব হয়েছে। আমার মনে হয়, এবারও সরকার ও বিরোধী দলগুলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটা সমঝোতায় পৌঁছাবে।
প্রথম আলো’র এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং দুর্যোগবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাকসুদ কামাল।
তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট। তাদের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে নানা কারণে। একটা কারণ ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডও একটা বিষয়। পরবর্তীকালে জননেত্রী শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলার ঘটনা একটা বিরাট ক্ষত সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সময়ে অগণতান্ত্রিক শক্তির হস্তক্ষেপের কারণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নষ্ট হয়ে গেছে। পারস্পরিক আস্থাহীনতাই প্রকট হয়ে উঠেছে।
যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় যাবে, তাদের ওপর আস্থা রেখে নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী হতে হবে, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্র নির্বাচন কমিশনকেই প্রস্তুত করতে হবে। এটা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। দুর্ভাগ্যের বিষয়, সব সরকারের আমলেই বিরোধী দলগুলো নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রশ্ন তোলে, অনাস্থা প্রদর্শন করে। কিন্তু কোনো একটা পয়েন্টে এসে তো আমাদের সবাইকে একমত হতেই হবে, দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য।
আমার ধারণা, সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একটা সমঝোতা হবে, বিরোধী দলগুলো বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। দেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে এবং সরকারের উচিত হবে সে ধরনের একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা। এ সরকারের আওতায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উপযোগী একটা পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি করা অত্যন্ত প্রয়োজন।আমার মনে হয় না সেই পরিবেশ থেকে দেশ খুব একটা বিচ্যুত হয়েছে। আমার মনে হয়, দেশের মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়।
নির্বাচন পর্যন্ত যাওয়াও সম্ভব হবে। সরকার বিরোধী দলকে সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছে, তারা সে সমাবেশ করেছে। এই অনুমতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে আমার মনে হয়েছে যে সরকারের ভেতরেও এই উপলব্ধিটা আছে যে সকলে মিলেই নির্বাচনটা করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, এভাবেই নির্বাচন হবে। কারণ, রাজনৈতিক দলগুলো একটা পর্যায়ে এসে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা উপলব্ধি করে। অতীতে আমরা এটা দেখেছি যে সংকটের শেষ মুহূর্তে গিয়ে সবাই একটা উপলব্ধিতে পৌঁছান। কিন্তু যে সংস্কৃতি আমরা এখানে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি, সেটা হলো নির্বাচনের পরে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করা।
আমার মনে হয় না ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন হবে। আর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যে দায়িত্ব পালন করার কথা, অনেকে তা পালন করেননি। জনগণ নির্বাচনে ভোট দিতে চেয়েছে, কিন্তু অনেকে নির্বাচনে আসেননি। বিএনপির উচিত ছিল নির্বাচনে অংশ নেওয়া। তারপর যদি কিছু ঘটত, তাহলে তারা সেটা বলতে পারত, জনগণ সেটা শুনত। কিন্তু তারা নির্বাচনে অংশই নেয়নি, বরং সরকারকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, ব্যাপক সহিংসতা করেছিল। এসব না করে তারা যদি নির্বাচনে যেত, ভোটযুদ্ধের মাঠে থাকত, তাহলে পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত। নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি, এ রকম অভিযোগ যদি তারা উত্থাপন করতে পারত, তাহলে হয়তো আরেকটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ক্ষেত্র সৃষ্টি হতে পারত।
নির্বাচন কমিশনের বিষয়ে যদি কারও কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে তারা সেটা উত্থাপন করতে পারে। সেটিও রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপার। নির্বাচন কমিশন একটি প্রতিষ্ঠান, এটি কোনো ব্যক্তির নয়। প্রতিষ্ঠানের যে আইনকানুন আছে, যেসব দায়িত্ব-কর্তব্য আছে, সেগুলো যদি সুষ্ঠুভাবে প্রতিপালন করা সম্ভব হয়, তাহলে অবশ্যই সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য হতে পারে, নির্বাচনী জোট হতে পারে। অতীতে হয়েছে, এবারও ঐক্য প্রক্রিয়া চলছে বলে আমরা সংবাদমাধ্যমে জানতে পারছি। আমি এই ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে খারাপ কিছু দেখি না। ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে যাঁরা আছেন এবং এর বাইরে আছেন, শুধু জামায়াতে ইসলামীকে বাদ দিয়ে সবাই মিলে সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করে সব দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত। জনগণ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চায়। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত জনগণের এই আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া।(প্রথম আলো)