আবেদনের সাত বছরেও মেলেনি পাসপোর্ট

প্রতিবেদক : এমএন /আর
প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১১:০১ পূর্বাহ্ণ

মোহনানিউজ ডেস্ক: পাসপোর্ট অফিসের ঘুষ বাণিজ্য আর হয়রানির নজিরবিহীন উদাহরণ হয়ে উঠেছেন এক ব্যাংক কর্মকর্তা। ২০১১ সালে পাসপোর্টের জন্য আবেদন জমা দেন তিনি। ২০১৮ সালেও তিনি পাসপোর্ট হাতে পাননি। দীর্ঘ ৭ বছর ধরে তিনি পাসপোর্ট অফিসে শুধু ঘুরছেন।

ভুক্তভোগী বলছেন, পাসপোর্ট অফিসে গেলে কর্মকর্তারা তাকে বলেন, শিগগিরই তার পাসপোর্ট হয়ে যাবে। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হয় না। চরম হয়রানি আর ভোগান্তির শিকার এই ব্যক্তির নাম ফজলুল হক। বর্তমানে তিনি জনতা ব্যাংক রাজশাহী শাখায় কর্মরত।

সূত্র জানায়, ফজলুল হক ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজশাহী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে আবেদন জমা দেন। যথারীতি তার আবেদন জমা হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর তার পাসপোর্ট ডেলিভারি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত দিনে পাসপোর্ট আনতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন তার আবেদনের পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট আসেনি। তাকে কিছুদিন পর যোগযোগ করতে বলা হয়। মাসখানেকের মধ্যে তিনি আরও দুই-তিনবার যোগাযোগ করেন। প্রতিবারই বলা হয় অপেক্ষা করেন। কিন্তু তার অপেক্ষার পালা আর শেষ হয়নি।

পাসপোর্ট অফিসের এই সীমাহীন হয়রানির বর্ণনা দেন ফজলুল হক। তিনি বলেন, ‘আমি যখন আবেদন জমা দিই তখন রাজশাহী বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসটি ছিল নগরীর উপশহর এলাকায়। অফিসটি মূলত দালালদের স্বর্গরাজ্য ছিল। দালাল ছাড়া সেখানে ঢোকাই যেত না। নানা ঝক্কি-ঝামেলা পোহানোর পর আবেদন জমা দেন তিনি। কিন্তু পুলিশ রিপোর্টের জন্য আবেদন আটকে গেলে তার ভোগান্তির নতুন পর্ব শুরু হয়। ফজলুল হক বলেন, ‘২০১১ সালের পর গত ৭ বছর ধরে মাঝে-মধ্যেই পাসপোর্ট অফিসে যাই। এখনও তারা আমাকে বলে আরেকটু অপেক্ষা করেন।’

ফজলুল হকের পাসপোর্ট আবেদন সংক্রান্ত কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট তার বিপক্ষে গেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে পেশাসংক্রান্ত তথ্য গরমিল পাওয়ায় নেগেটিভ রিপোর্ট দেয়া হল।

পেশা গোপনসংক্রান্ত রহস্যের ব্যাখ্যা দেন ফজলুল হক নিজেই। তিনি বলেন, ‘আবেদন জমা দেয়ার সময় আমি মাস্টার্সের ছাত্র ছিলাম। কিন্তু যথাসময়ে পুলিশ ভেরিফিকেশনে আসেনি। ইতিমধ্যে আমি সরকারি চাকরি পেয়ে যাই। এরপর পুলিশ পেশা গোপনের তথ্য দিয়ে রিপোর্ট পাঠায়। বিষয়টি পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের জানানো হলে তারা আমাকে পুলিশের বিশেষ শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। আমি পুলিশের বিভিন্ন কার্যালয়ে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি খোলাসা করি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। আমার পাসপোর্ট আর হয়নি।’

পাসপোর্ট অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে একদিকে পাসপোর্টের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনের দুর্বলতা ও অসারতা ফুটে উঠেছে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট কর্মকর্তারাও এর দায় এড়াতে পারেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উচ্চপদস্থ পাসপোর্ট কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, দু’জন কর্মকর্তার কারণে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। এদের একজন সেলিনা বানু, অন্যজনের নাম রোজী খন্দকার। কারণ এ ঘটনার সময় রাজশাহী পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বে ছিলেন তারা। এদের মধ্যে সেলিনা বানু চরম অদক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি এখন পাসপোর্ট অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের চেয়ারে বসে গেছেন। আর রোজী খন্দকারের বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ। রাজশাহী পাসপোর্ট অফিসটিকে তিনি টাকা বানানোর মেশিনে পরিণত করেছিলেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘তিনি সদ্য যোগদান করেছেন। ঘটনাটি জানার পরপরই তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন। ভুক্তভোগীর কাছ থেকে নতুন করে একটি আবেদনও ইতিমধ্যে জমা নেয়া হয়েছে। দ্রুততম সময়ে তাকে পাসপোর্ট দেয়া হবে।’

ঘটনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পাসপোর্ট অফিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাসুদ রেজওয়ান বিস্ময় প্রকাশ করেন। সোমবার তার কার্যালয়ে তিনি বলেন, ভুক্তভোগী ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ করলে ঘটনার তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভেরিফিকেশনের নিয়ম অনুযায়ী পুলিশ শুধু আবেদনকারীর ঠিকানা ও অপরাধ তথ্য যাচাই করে দেখবে। পেশাসংক্রান্ত বিষয়ে নেগেটিভ রিপোর্ট পাঠানো অনাকাক্সিক্ষত।(যুগান্তর)

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন