বিভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্যের ডাক প্রধানমন্ত্রীর
বিভেদ ভুলে দেশকে আরো উন্নত করার প্রত্যয় নিয়ে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, সামনে অনেক কাজ আমাদের। আরও কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সেই বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে পারব। এখন আমাদের প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে শেখ হাসিনা আরও বলেছেন, আমাদের ঐক্যের যোগসূত্র হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাম্য ও ন্যায়বিচার এবং উন্নয়ন ও অগ্রগতি।
জাতীয় সংসদ সব সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু হবে ঘোষণা দিয়ে সরকারপ্রধান বলেছেন, একাদশ সংসদে বিরোধীদলের সদস্য সংখ্যা নিতান্তই কম। তবে সংখ্যা দিয়ে আমরা তাদের বিবেচনা করব না। সংখ্যা যত কম হোক, সংসদে যেকোনো সদস্যের ন্যায্য ও যৌক্তিক প্রস্তাব, আলোচনা, সমালোচনার যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলের নির্বাচিত সদস্যদের শপথ নিয়ে সংসদে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, সরকারি সেবা খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় জীবনের সর্বত্র আইনের শাসন সমুন্নত রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করব।
শেখ হাসিনা আরো বলেছেন, বিজয়ের পর আমরা সরকার গঠন করেছি। সরকারের দৃষ্টিতে দলমত নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিক সমান। আমরা সবার জন্য কাজ করব।
শেখ হাসিনা বলেছেন, আমি জানি, দুর্নীতি নিয়ে সমাজের সর্বস্তরে অস্বস্তি রয়েছে। তাই আমি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের নিজেদের শোধরানোর আহ্বান জানাচ্ছি। আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতি উচ্ছেদ করা হবে।
তিনি বলেছেন, তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির নির্মূল করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। দুর্নীতি বন্ধে জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি। তাই, গণমাধ্যমের সহায়তায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির কাজ অব্যাহত থাকবে।
তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেছেন, ইতিমধ্যেই মাদক, জঙ্গি তৎপরতা এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে সফলতা অর্জন করেছি। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যেখানে হিংসা-বিদ্বেষ হানাহানি থাকবে না। সব ধর্ম-বর্ণ এবং সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন। সবাই নিজ নিজ ধর্ম যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালন করতে পারবেন।
তিনি বলেছেন, বৈশ্বিক প্রভাবে কিংবা স্থানীয় প্ররোচনায় আমরা কিছু কিছু তরুণকে বিভ্রান্তির শিকার হয়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হতে দেখেছি। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামে সন্ত্রাসের স্থান নেই। আমি সমাজের সবাইকে মাদকাসক্তি ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।
তরুণেরাই দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারুণ্যের সৃষ্টিশীলতা, উদ্যম এবং শক্তির ওপর আমাদের পূর্ণ শ্রদ্ধা ও আস্থা রয়েছে।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করার জন্য সকলের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেছেন, ২০১৮ সালে আরেক বিজয়ের মাসে এ দেশের ভোটারগণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী আওয়ামী লীগকে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছে, আমাদের দেশ সেবার সুযোগ করে দিয়েছে।
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় ছিল খুবই প্রত্যাশিত জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনের আগে দেশি-বিদেশি জরিপগুলিও এ রকমই ফলাফলের ইঙ্গিত দিয়েছিল। লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিট এবং রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের জরিপের ফল আপনারা লক্ষ্য করেছেন।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের এই ল্যান্ড-স্লাইড বিজয়ের কয়েকটি কারণ আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। তা হলো বিগত ১০ বছরে দেশে যে উন্নয়ন হয়েছে, সাধারণ মানুষ তার সুফল পেয়েছেন।
শেখ হাসিনা বলেছেন, আমাদের নির্বাচনী প্রস্তুতি ছিল ব্যাপক। সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি আমরা ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছি।
এবারের এই নিরঙ্কুশ সমর্থন আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনাদের এই রায়কে দেশবাসীর সেবা এবং জাতির পিতার (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) অসমাপ্ত কাজ শেষ করার ও সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ বলে মনে করি।
একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ’ স্লোগান সংবলিত নির্বাচন ইশতেহার ঘোষণা করেছি। আপনারা অনেকেই এই দলিলটি ইতিমধ্যে পড়েছেন।
আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমাদের যেকোনো নীতিমালা প্রণয়নে এবং উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে এই ইশতেহারটি পথ-নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।
শেখ হাসিনা বলেছেন, তার সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শিক্ষিত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।
তিনি বলেছেন, ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আমরা ২০২০-২০২১ সালে মুজিব বর্ষ এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব উদযাপন করব। বাঙালি জাতির এই দুই মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা দেশকে আর্থসামাজিক খাতে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই। আর এর কৌশল হিসেবে আমরা ভিশন ২০২১ এবং ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়ন করছি। পাশাপাশি, জলবায়ুর ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জনের জন্য আমরা ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ নামে শতবর্ষের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি।