আনোয়ার খানকে ঘিরেই প্রার্থীদের যত টেনশন
নিজস্ব প্রতিবেদক: সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে জনগণের কাছে প্রার্থীদের পদচারন ততই বাড়ছে। সরকারের উন্নয়ন সম্মলিত লিফলেট বিতরণ, গণসংযোগ ও বিভিন্ন সামাজিক কাজে সময় দিচ্ছেন লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের প্রার্থীরা। সম্প্রতি এ আসনে আওয়ামী একাধিক প্রার্থী নৌকার পক্ষে প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে বিএনপি নির্বাচন করবে কিনা এ নির্দেশনার অপেক্ষায় তাদেরকে প্রচারনায় দেখা যাচ্ছে না।
এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য (এমপি) তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব লায়ন এম এ আউয়াল। সম্প্রতি তিনি পদ থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। এ কারনে দলটি প্রচারনায় পিছিয়ে রয়েছে। এতে নির্বাচনী হিসেবে ভিন্নসূত্র যোগ হয়েছে। তিনি এখন রয়েছে ভিন্নমতে। জোটগত কারণে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে নৌকা প্রতিক নিয়ে তিনি এমপি নির্বাচিত হন।
এদিকে আসনটি থেকে এলডিপির যুগ্ম-মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম মনোনয়ন পাওয়ার জোর লবিং করছেন। তিনি জনগণের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছেন সবসময়। সাধারণ মানুষের কাছে যাচ্ছেন তিনি। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন তিনি। তবে এলডিপিকে এখানে ছাড় দিতে নারাজ স্থানীয় বিএনপি।
শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, বিএনপি এ আসনে আমাকে মনোনয়ন দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ইতিমধ্যে হাইকমান্ড থেকে আমাকে সংকেত দিয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে আমি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। আমি নির্বাচন করলে বিজয় নিশ্চিত হবে।
সূত্র জানায়, ১০টি ইউনিয়ন ও রামগঞ্জ পৌরসভা নিয়ে লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসন। জাতীয় সংসদের ২৭৪ নম্বর এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ১৩ হাজার ৭২ জন। এরমধ্যে পুরুষ এক লাখ ৮৮৩ এবং নারী এক লাখ ৪৮৯ জন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রয়াত রশিদ মিয়া আওয়ামী লীগ থেকে এমপি হয়েছিলেন। এরপর আর ক্ষমতার স্বাদ পায়নি দলটি। সবশেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জোটগত কারণে তরিকতের প্রার্থী এমপি হয়। এরআগে ১৯৯১-২০০১ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার বিএনপি থেকে নির্বাচিত হন প্রয়াত জিয়াউল হক জিয়া। তিনি এলজিইডি প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তখন রামগঞ্জে সড়ক ব্যবস্থাসহ অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, ২০০১ সালের পর রামগঞ্জে ‘সেভেন স্টার বাহিনী’ গঠন করে জিয়াউল হক জিয়া শাসন করেছেন। তখন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা অত্যাচার-নির্যাতন ও হামলা-মামলায় অতিষ্ঠ ছিল।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব এমএ আউয়াল এমপি নির্বাচিত হন। গত ১৮ এপ্রিল তরিকত ফেডারেশনের দপ্তর সম্পদক মোঃ সেলিম মিয়াজী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এম এ আউয়ালকে পদ থেকে অব্যাহতির কথা জানানো হয়। দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমকে অধিকতর গতিশীল করার লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানানো হয়। তখন সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীকে মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়। এবার আওয়ামী লীগ থেকে ছয়জন প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।
আওয়ামী লীগ
সরোজমিনে জানা গেছে, এ আসনে আওয়ামী লীগ নেতারা জনসম্পৃতিতে ছিলেন। সম্প্রতি দলীয় কোন্দল থাকায় একাধিক প্রার্থী তাদের নিজের মত করে গণসংযোগ করে যাচ্ছে। এখন প্রার্থীরা এলাকাতে বেশি সময় দিচ্ছেন।
আনোয়ার হোসেন খান গত এক বছর ধরে ১০ টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় বিনামূল্যে চাল ও অর্থ সহায়তা দিচ্ছেন। এছাড়া স্কুল-মাদ্রাসা ও কলেজসহ ধর্মীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনুদান দিচ্ছেন।কেন্দ্রীয়ভাবেও তার অবস্থান ভালো রয়েছে। এনিয়ে সবপ্রার্থী টেনশনে রয়েছেন।
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ শাহজাহান রামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও একাধিকবার সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। ২০১৪ সালেও তিনি আওয়ামী লীগ তাকে মনোনয়ন দেয়। পরে জোটগত কারনে দলের সিদ্ধান্তের কারনে তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন। দলের সাংগঠনিক ভিত পাকাপোক্ত করতে সরকারি বরাদ্ধ দিয়ে রাস্তা-ঘাটসহ অবকাঠামোর উন্নয়নসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদান করে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
বিএনপি-জামায়াতের সহিংতার চিত্র ও আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন সম্বলিত লিফলেট বিতরণ করে জনগণের কাছে নৌকার ভোট চাচ্ছে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোজাম্মেল হক মিলন। তিনি ওই আসনের জনগণের কাছে থেকে সমসময় দলের নেতাকর্মীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করছেন।
আওয়ামী লীগ নেতা সফিকুল ইসলাম নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। তিনি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থাকাকালে রামগঞ্জের উন্নয়নের কথা জনগনকে স্বরণ করে দিয়ে তাকে সমর্থন দেওয়ার আহবান জানান।
এম এ মমিন পাটওয়ারীও নিয়মিত উঠান বৈঠক ও নারী সমাবেশ করছেন। তিনি সরকারের উন্নয়ন সাফল্য জনগনের কাছে তুলে ধরে শেখ হাসিনার জন্য নৌকায় ভোট চাইছেন।
অন্যদিকে বিএনপি নেতাদের তেমন প্রচারনা দেখা না গেলেও খালেদা জিয়াকে মুক্তি করাই এখন তাদের বড় আন্দোলন। নির্বাচনীয় প্রচারণায় তাদেরকে এখনও আর দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবে কিনা দলীয় হাই কমান্ডের নির্দেশের অপেক্ষা করছেন তারা।
মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন- জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ শাহজাহান, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সফিকুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক এমএ মমিন পাটওয়ারী, জেলা কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোজাম্মেল হক মিলন, উপজেলা কমিটির সভাপতি সফিক মাহমুদ পিন্টু ও সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন খান।
বিএনপি থেকে সাবেক এমপি নাজিম উদ্দিন আহমেদ, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মনির আহমেদ ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ মনোনয়ন চাইবেন।
এমপি আউয়াল বলেন, রামগঞ্জে গত সাড়ে চার বছরে এক হাজার কোটি টাকার রাস্তা-ঘাট, অবকাঠামো বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ করেছি। তরিকত ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে সমৃদ্ধ রামগঞ্জ গড়ার চেষ্টা করেছি। আমার করা উন্নয়ন আর জোটগত কারনে যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে অসমাপ্ত কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবো। এতে আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে।
সফিকুল ইসলাম বলেন, আমি ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতি করে আসছি। ৯৬ সালে দল থেকে মনোনয়ন পেয়ে ভোট করেছি। সেখানে পরিকল্পিতভাবে ভোট ডাকাতি করে আমাকে বিএনপি হারিয়েছে। ৮৬ সালে রামগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। তখন থেকেই জনগণ আমাকে ভালোবাসতো। আমি জনগণের জন্য উন্নয়ন করেছি। রামগঞ্জে আমার ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসব বিবেষনা করে আমাকে মনোনয়ন দিবে বলে আমার বিশ্বাস।
আনোয়ার হোসেন খাঁন বলেন, অসহায় মানুষের পাশে থেকে আমি রামগঞ্জের উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছি। জনগণের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে ও নৌকার বিজয়ের লক্ষ্যে আমি কাজ করে যাচ্ছি।
লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার পর তাঁর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অক্লান্তভাবে তৃনমূল পর্যায়ে কাজ করছি। সরকারের বিভিন্ন সুফল জনগণের কাছে তুলে ধরছি। আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি রামগঞ্জ আসনটি উপহার দিতে পারবো।
সৈয়দ মোজাম্মেল হক মিলন বলেন, দুঃসময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দলীয় কর্মসূচী পালন করেছি। তখন দলের দুঃসময়ে আমি নেতাকর্মীদের সাথে ছিলাম। এখনো আছি। আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি রামগঞ্জের জন্য কাজ করে যাবো।
বিএনপি
রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। দলটি ক্ষমতায় থাকাকালে দৃশ্যমান কিছু উন্নয়ন করেছেন। বর্তমানে দলটির কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। এর ঢেউ লেগেছে তৃনমূলের ওয়ার্ড ও ইউনিয়নগুলোতে। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে জিয়াউল হক জিয়া বিএনপির মনোনয়ন থেকে বাদ পড়েন। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নাজিম উদ্দিন আহমেদ বিজয়ী হন। তিনি এবারও বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইছেন। এছাড়া বেগম খালেদা জিয়া পাশ্ববর্তী জেলা ফেনীর মেয়ে হওয়ায় মানুষের আবেগ-ভালোবাসাও কাজ করে ভোটের মাঠে।
নাজিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে আমরা অংশ নিতে প্রস্তুত আছি। এখানের ৮০ ভাগ লোক আমাদের দল করে। বর্তমান সরকারের অত্যাচার-অবিচারে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ। আমি আবার মনোনয়ন পেলে ধানের শীষ জয়ী হবে।
মনির আহমেদ বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে দেশ ও জনগণের কল্যাণ হয়। দলীয় নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত রাখতে অতীতেও কাজ করেছি, ভবিষ্যতেও করবো। যথাযথ মূল্যায়ন করে দল আমাকে মনোনয়ন দেবে এমনটাই প্রত্যশা করছি।
অন্যন্যা
আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও তরিকত ফেডারেশন ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলগুলো সাংগঠনিক তৎপরতা নেই বললেই চলে। এখান থেকে জাতীয় পার্টির উপজেলা সভাপতি মোঃ সিরাজুল ইসলাম পাটওয়ারী, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মোঃ মনির হোসেন ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) এম এ গোফরান নির্বাচনে অংশ নিবেন বলে শোনা যাচ্ছে।
লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদরের একাংশ) আসনের খবর দেখতে চোখ রাখুন মোহনানিউজে।