রামগঞ্জে নিষিদ্ধ ট্রাক্টরের দাপট, ধূলাবালিতে একাকার

প্রতিবেদক : এমএন /আর
প্রকাশিত: ১৭ মার্চ, ২০২০ ৬:১৭ অপরাহ্ণ

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলায় নিষিদ্ধ ট্রাক্টর ট্রলির যন্ত্রণা চরম আকার ধারণ করেছে। উপজেলার অভ্যন্তরীণ রাস্তায় প্রতিদিন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অবৈধ ৪ শতাধিক এ দানব যান। এতে হতাহতের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলো চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পড়ছে।

সঙ্গে ধুলাবালির বেশ দাপট রয়েছে। এতে লোকজন শ্বাস-কষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। উপজেলার সচেতন লোকজন বর্তমানে ট্রাক্টর যন্ত্রণাকে ‘প্রধান সমস্যা’ হিসেবে দেখছেন।


এদিকে জেলা ও উপজেলায় মাসিক আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় একাধিকবার ট্রাক্টর চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়।


এছাড়া অতিষ্ট ছাত্র-জনতা প্রতিবাদ সভা, স্মারকলিপি, মানববন্ধন ও প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করে প্রতিকার চেয়েছেন। সম্প্রতি ভ্রাম্যামাণ আদালতে জেল-জরিমানা করেও কোন সুফল আসছে না। ক্ষমতাসীন দলের একটি চক্র এ অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ক্ষুদ্ধ ভূক্তভোগীরাও।


অন্যদিকে গত রবিবার (৮ মার্চ) জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন খান অবৈধ ট্রাক্টর-ট্রলি চলাচল বন্ধের দাবি জানিয়ে বক্তব্য দেয়। এসময় তিনি ট্রাক্টরের জন্য রাস্তাঘাট ক্ষত-বিক্ষত জানিয়ে ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরেন। এরআগে গত বছরের ১৪ এপ্রিল রামগঞ্জ উপজেলা পরিষদের মাসিক আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় ওই এমপি ট্রাক্টর বন্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু ট্রাক্টর মালিক ও চালকরা যেন তা পাত্তা দিচ্ছে না!


অভিযোগ রয়েছে, রামগঞ্জে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যম সারির দুই-তিনজন নেতা ট্রাক্টর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁরা স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এ যান চলাচলে সহযোগিতা করছেন। উপজেলা মোটর চালক সমবায় সমিতির নামে ট্রাক্টর গুলো চালায়। ওই সমিতির সাধারণ সম্পাদক জানায়, রামগঞ্জে তাদের অধীনে ১৯৫ টি ট্রাক্টর অর্šÍভূক্ত রয়েছে। উপজেলাব্যাপী এসব চলাচল করে। তবে অন্য একটি সূত্রের ভাষ্যমতে, সমিতির বাহিরে আরো দুই শতাধিক ট্রাক্টর চলাচল করে।


স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রামগঞ্জে ২৪ টি ইটভাটা রয়েছে। এরমধ্যে ৭ টির লাইসেন্স রয়েছে। এসব ভাটায় শুষ্ক মৌসুমে প্রতিদিন ট্রাক্টর দিয়ে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্নস্থান মাটি ও ইট পরিবহন করা হয়। এতে রাস্তাঘাট ধুলাবালিতে একাকার থাকে। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। ফসলি জমির উপরিভাগে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করায় এবার উপজেলায় চাষাবাদ কম হয়েছে। এতে বিস্তির্ণ জমি খালি পড়ে আছে।

নোয়াগাঁও, ভাদুর, দরবেশপুর ও ভোলাকোটসহ কয়েকটি ইউনিয়নের রাস্তায় ধুলাবালির কারণে হাটাও যেন দায়! পৌরসভাসহ উপজেলার ১০ টি ইউনিয়নে ৩৭৫ টি কাঁচা-পাকা রাস্তা রয়েছে। গত দুই বছরে অধিকাংশ রাস্তার ইট-খোয়া উঠে, ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত এবং ভেঙ্গে চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পেেছ। এ সময়ের (দুই বছর) মধ্যে বেপরোয়া ট্রাক্টরের চাপায় ছাত্র-শিশুসহ অন্তত ১৫ জনের প্রাণহাণি ঘটেছে। শিশু ও অদক্ষ তরুণদের হাতে দায়িত্বে থাকা ট্রাক্টরেরর চাপায় আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে অনেককেই। রাজনৈতিক চাপে ঘটনাগুলো টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়া হয়।


উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, চলতি মাসে রামগঞ্জ পুলিশ বক্স চত্বর ও বালুয়া চৌমুহনি সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় ট্রাক্টরসহ অবৈধ যানবাহন চালকদের নামে ১৫ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৭৬ হাজার ৫০০টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।


ট্রাক্টর চালক ইসমাইল হোসেন ও মো. মতিন জানায়, তারা এককালীন টাকা জমা দিয়ে সমিতির সদস্য হয়েছেন। এরপর ট্রাফিকসহ প্রশাসন ম্যানেজ করতে মাসিক চাঁদা নেওয়া হয়। কয়েকজন চালককে জেল-জরিমানা দেওয়ায় এখন আতঙ্কে মধ্যে থাকতে হয়।


ট্রাক্টর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা রামগঞ্জ উপজেলা মোটর ড্রাইভার সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিচয়দানকারী মো. মনির হোসেনের ভাষ্যমতে, ট্রাক্টরের কারণে ক্ষতির চেয়ে উপকারই বেশি। সরু রাস্তার কারণে সহজে মালামাল পরিবহণ করা যায়। রামগঞ্জে এ পেশার সঙ্গে চালক-মালিকসহ অন্তত দেড় হাজার মানুষ জড়িত। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় বাধ্য হয়েই আমরা ট্রাক্টর চালাচ্ছি।
নোয়াগাঁও ইউপির চেয়ারম্যান হোসেন মোহাম্মদ রানা ও ভোলাকোট ইউপির চেয়ারম্যান বশির আহমেদ মানিক জানায়, জেলা ও উপজেলার শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এমপি কয়েকবার ট্রাক্টর বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু কোন অদৃশ্য কারণে বন্ধ হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। এর কারণে এক মাস আগে করা রাস্তাও নষ্ট হয়ে গেছে। ট্রাক্টর চক্রটি ফসলি জমির মাটি কেটে ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।


জানতে চাইলে জেলা ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক (টিআই) মামুন আল আমিন বলেন, আমরা অভিযান চালিয়ে অবৈধ ট্রাক্টর জব্দ করতেছি। অনেকে তা না চালানোর মুচলেকা দিয়ে যাচ্ছেন। সচেতনতার পাশাপশি সবার সহযোগিতা থাকলে রাস্তায় অবৈধ যান চলতে পারবে না।
রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনতাসির জাহান বলেন, নিষিদ্ধ যান বন্ধের বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এনিয়ে নিয়মিত অভিযান চলছে। অনেককেই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অভিযান চলবে।


এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের এমপি আনোয়ার হোসেন খান বলেন, অবৈধ ট্রাক্টরের কারণে রামগঞ্জের মানুষ অতিষ্ট। ট্রাক্টর, ইটভাটা বন্ধ এবং দখল হওয়া খাল উদ্ধারের জন্য আমি প্রশাসনকে বলেছি। এরসঙ্গে দলের কোন নেতাকর্মী জড়িত থাকলে ছাড় দেওয়া হবে না।

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন