বিলুপ্তির হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

প্রতিবেদক : এমএন /আর
প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

অব্যাহত দখল, স্থাপনা নির্মাণ, বনের অভ্যন্তরে কৃষিজমি তৈরি, বসতি স্থাপন এবং গাছ কেটে উজাড় করার ফলে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে শাল-পিয়াল বনখ্যাত গাজীপুরের বিস্তীর্ণ বনভূমি। ভালো নেই ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানও। শিল্পসমৃদ্ধ কালিয়াকৈর, রাজেন্দ্রপুর ছাড়াও দখলদারদের কালো হাত এখন বিস্তৃত হয়েছে অন্য রেঞ্জ ভাওয়াল, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, কাচিঘাটা ও শ্রীপুরেও। 
১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনে সরকারের অধীনে আসে গাজীপুরের বিস্তীর্ণ বনভূমি। বনের উদ্ভিদ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে ১৯৮২ সালে ভাওয়াল অরণ্যকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে সরকার। কিন্তু কিছুতেই সে বন রক্ষা করা যাচ্ছে না। বনখেকো বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা গাছ কেটে, বন উজাড় করে কারখানা তো গড়ে তুলছেই, সেই সঙ্গে হাল সময়ে যুক্ত হয়েছে রিসোর্ট, বাংলো ও বাগানবাড়ি তৈরির প্রকৃতিঘাতী প্রবণতা।
এসব কারণে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে হুমকির মুখে পড়েছে এখানকার জীববৈচিত্র্য- বিশেষ করে এখানকার ঐতিহ্যবাহী শাল, গজারি, কড়ই, অর্জুন, সর্পগন্ধা, শিমুলসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ বীরুৎ গুল্ম ও নানা প্রজাতির অর্কিড। অবৈধ কারখানার বর্জ্যে দুষিত হয়েও মারা যাচ্ছে বিপুল গাছ। অন্যদিকে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হয়ে পড়ায় বিলুপ্ত হতে চলেছে হরিণ, বানর, কাঠবিড়ালী, সজারু, বনমোরগ, খরগোশ, বেজি ও নানা প্রজাতির সাপসহ অন্যান্য প্রাণী। এখানকার প্রবীণ অধিবাসী এবং প্রাণী গবেষকরা জানান, গাজীপুরের ভাওয়াল এস্টেটে এক সময়, বাঘ, চিতাবাঘ, কালোচিতা, মেঘলা চিতা, হাতি, ময়ূর, মায়া হরিণ ও সম্বর হরিণ বাস করত। সেগুলো এখন আর নেই। এখনো এ বনে খেঁকশিয়াল, বাঘডাস, বেজী, কাঠবিড়ালী, গুঁইসাপসহ আরও কয়েক প্রজাতির সাপ রয়েছে। হরবোলা, বসন্তবাউড়ি, শ্যামা, সুইচোরা, টিয়া ইত্যাদি পাখির বিচরণ রয়েছে এখনো। কিন্তু এ সবই এখন বিলুপ্তির মুখে পড়েছে। কারণ বন উজাড়, দূষণ, বসতি স্থাপন, লোকালয় ও হাটবাজার গড়ে তোলার ফলে প্রাণীদের আবাসস্থল নষ্ট হয়ে পড়ছে। যদিও পরিকল্পিতভাবে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রজননের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে গাজীপুরের প্রায় ৪০০০ একর জমিজুড়ে তৈরি করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাফারি পার্ক। সাফারি পার্কটি কোনো রকম দখলের ঝুঁকিতে না পড়লেও গাজীপুরের বাকি ৫২ হাজার একর বনভূমি দখলের মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে দখল হয়ে গেছে ১২ হাজার একরের মতো বন। প্রভাবশালী শিল্প মালিকদের গড়ে তোলা অবৈধ কারখানার কেমিক্যাল বর্জ্যে মরছে শালগাছসহ বিভিন্ন জাতের বনজবৃক্ষ। মরছে বিপন্ন বন্যপ্রাণী।
জেলার ৬টি রেঞ্জেই বনভূমি দখল করে এবং কোথাও কোথাও বনভূমি ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিল্প কলকারখানা। অবৈধ এসব কলকারখানার সুষ্ঠু ড্রেনেজ ব্যবস্থাও নেই। কারখানার তরল বিষাক্ত বর্জ্য ঢুকে পড়ছে বনে।
সরেজমিন দেখা দেখা গেছে, জেলার কালিয়াকৈর ও রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জে হাজার হাজার শালগাছসহ বিভিন্ন জাতের বনজবৃক্ষ মারা গেছে। কালিয়াকৈর পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার বাসিন্দা আছিয়া বেগম ও সুশান্ত কুমার জানান, ওই এলাকায় শিল্প-কলকারখানার তরল বিষাক্ত বর্জ্যরে কারণে বন ধ্বংস হচ্ছে। মৌচাক এলাকার ফরিদ ও লিপি বেগম বলেন, কোকাকোলা কোম্পানির বিষাক্ত তরল বর্জ্যে ওই এলাকার শালগাছগুলো মারা যাচ্ছে। বর্ষাকালে প্লাবনের সময় কারখানার বিষাক্ত তরলবর্জ্য বনের ভেতর প্রবেশ করে। এসব বর্জ্য পুরো এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। ফলে আশপাশের কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। জেলায় বনভূমির বহু স্থানকে কারখানার ময়লা আবর্জনার ভাগাড় হিসেবে ব্যবহার করছে অনেকে।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাস্টারবাড়ি এলাকা থেকে রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা এলাকা পর্যন্ত মহাসড়কের পূর্ব দিকে অসংখ্য মৃত শালগাছ খুঁটির মতো দাঁড়িয়ে আছে। রাজেন্দ্রপুর আরপি গেইট সংলগ্ন এলাকার আব্দুল খলিল ও সুলতান বেপারীও বলেন, এই এলাকার কারখানার কেমিক্যাল ও ময়লা-আবর্জনার কারণে বন দূষিত হচ্ছে।
বন দূষণের ব্যাপারে কথা হয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক স্বপন কুমার সরকারের সঙ্গে। তিনি খোলা কাগজকে জানান, শিল্পের বিষাক্ত তরল বর্জ্যরে কারণে গাছের বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। টানা জলাবদ্ধতায় গাছগুলো মারা যাচ্ছে। বন দূষণের ফলে বনে বসবাসকারী বিভিন্ন কীটপতঙ্গ মারা যাচ্ছে। সে কীটপতঙ্গ কমে যাওয়ায় দেশীয় পাখিও কমে যাচ্ছে বনে।
রসায়নবিদ সাঈদ চৌধুরী বলেন, গাজীপুরে বন সংলগ্ন অনেক ডায়িং, কম্পোজিট, রাসায়নিক ও ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব কারখানায় এসিড, ক্ষার, এজো ডাই, এনজাইম জাতীয় রাসায়নিক ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন শিল্প-কলকারখানার বিষাক্ত তরল বর্জ্যে নদী, খাল-বিলের মাধ্যমে বনে প্রবেশ করছে। এতে নদী ও বনভূমি মারাত্মক দূষিত হচ্ছে। গাজীপুরের বনাঞ্চলে এক সময় বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী দেখা যেত। বনভূমিতে মানুষের অবাধ চলাচল ও শিল্প-কলকারখানার দূষিত তরল বর্জ্যরে কারণে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী হারিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে বন বিড়াল, সজারু, কাঠবিড়ালী ও দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে।
স্থানীয় অনেকে জানিয়েছেন, জেলায় বনসংলগ্ন অনেক জোতজমির মালিক বিভিন্ন কৌশলে শালগাছ মারছে। বিশেষ করে কালিয়াকৈর রেঞ্জে শালগাছের গোড়ায় লবণ মিশ্রিত গরম পানিসহ বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত তরল প্রয়োগ করছে। এতে ধীরে ধীরে শালগাছের মৃত্যু হচ্ছে। পরে মৃত শালগাছ রাতের আঁধারে গায়েব করে জোতজমির সীমানা বাড়ানো হচ্ছে।

গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সালাম সরকার জানান, জেলায় বনভূমি দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

৪০ একর বনভূমি রিসোর্টের দখলে ঢাকা বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিভাগটির অধীনে গাজীপুরে ১২৪৩৬.০৬ একর বনভূমি আছে। বেদখল আছে ১ হাজার ৫৪.৬৭৪৫ একর। গাজীপুর সদরের বিভিন্ন এলাকায় ৪০ একর বনভূমি বিভিন্ন রিসোর্ট ও শুটিং স্পটের নামে দখল করে রেখেছে প্রভাবশালী বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এসব রিসোর্টের মালিকরা প্রথমে বনসংলগ্ন কিছু জোতজমি কেনেন। পরে সুযোগ বুঝে বন দখল করে সীমানা প্রাচীর বাড়িয়ে নেন। অবৈধভাবে বনের বুক চিরে অধিকাংশ রিসোর্টেরই প্রবেশপথ করা হয়েছে। কোথায় কোথাও বনের পায়েচলা পথ প্রশস্ত করে বানানো হয়েছে সড়ক। এসব অবৈধ সড়কে বিকট শব্দ করে অবাধে চলছে বিভিন্ন পরিবহন। এতে শাল কপিচ বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।

অবৈধ পথ বন্ধ ও রিসোর্টগুলোর দখল থেকে বন উদ্ধারে বিভিন্ন সময় গাজীপুর জেলা প্রশাসক বরাবর উচ্ছেদ মোকদ্দমার প্রস্তাবও প্রেরণ করা হয়েছে। কিন্তু বনের জবরদখল তদন্ত ও উচ্ছেদ অভিযান চলে কচ্ছপগতিতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গাজীপুর সদরের বারইপাড়া মৌজার ১২৬১ নং সিএস দাগে অনন্ত রিসোর্ট দখল করেছে ০.৮২ একর বনভূমি। ১০৯৬ সিএস দাগে ১৬.০৫ শতাংশ বনভূমি শ্যামলী রিসোর্ট, ৫নং বিশৈয়া কুড়িবাড়ী মৌজার ১৫০৩ (পি), ১৫১৮ (পি), ১৫৩১(পি) সিএস দাগে ৪.৬৭ একর মেরিনা পার্ক অ্যান্ড রিসোর্টের দখলে। ৭৫৪(পি) সিএস দাগে ০.১৭৯৯ একর বাঁশরী পিকনিক স্পট, ৪নং বারইপাড়া মৌজার ০৩,২৭৯ ও ২৭১ নং সিএস দাগে ৩.৬৮ একর বনভূমি ভাওয়াল রিসোর্ট দখল করে রেখেছে। ১৮ নং আড়াইশ প্রসা মৌজায় ৬২১ নং সিএস দাগে ২.৫০ শতাংশ বনভূমি দখল করেছে হ্যাপিডে ইন আবাসিক হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট। ৬১৬ নং সিএস দাগে মেহের উদ্যান রিসোর্টের দখলে ১.৭৫ শতাংশ, ৪নং বারাইপাড়া মৌজার ৩নং সিএস দাগে ৭.৮৯ একর বনভূমি দখল করেছে সাবাহ গার্ডেন পিকনিক স্পট। এছাড়া ৫৮৭ নং সিএস দাগে সজনী ফিল্ম সিটির দখলে ১.৪০ একর ও ২৮৬৫ নং সিএস দাগে গ্রীনটেক রিসোর্ট দখল করেছে ০.৫৪ একর বনভূমি।

ঢাকা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগীয় প্রধান এ.এস.এম জহির উদ্দিন আকন খোলা কাগজকে বলেন, গত দুই বছরে গাজীপুরে ১৬৮.৮৪২ একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে। নামিদামি শিল্প কলকারখানার কবল থেকে ২.৫০ একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া সজনী ফিল্ম সিটির বিরুদ্ধে দেওয়ানি মোকদ্দমা চলমান আছে। অন্য ৯টি রিসোর্টসহ মোট ৩০টি উচ্ছেদ মোকদ্দমার জন্য গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ১৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। পিওআর মামলা হয়েছে ৩শটি। বন দূষণের দায়ে ২০টিরও বেশি মামলা হয়েছে। বনে বিভিন্ন ধরনের পরিবহন চলাচল বন্ধে ৫০টি স্থানে আরসিসি পিলার ও খুঁটি স্থাপন করা হয়েছে এবং বনরক্ষায় এ ধরনের কার্যক্রম চলমান থাকবে।

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন