আ.লীগে পাপুল ঠেকাও, বিএনপিতে খায়ের ভূঁইয়াই ভরসা
নিজস্ব প্রতিবেদক: নির্বাচনী প্রচারনায় ঝুঁকছে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। দলীয়কর্মী ও জনগণকে প্রতিনিয়তই সময় দিচ্ছেন নেতারা। নিজেদের অবস্থান থেকে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নের জন্য চেষ্টা করছেন।
৯৬ ও ২০০১ সালে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদরের একাংশ) আসনটি নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বর্তমানে ওই আসনে নিচ্ছুপ রয়েছে বিএনপি। মামলা হামলার ভয়ে মাঠে নামছেন না বিএনপি এমন বক্তব্য দলের সিনিয়র নেতাদের।
এদিকে জাতীয়পার্টি আর আওয়ামী লীগের নেতাদের সক্রিয় মাঠে দেখা যাচ্ছে। আসনটিতে চলছে তাদের নির্বাচনীয় কার্যক্রম। জোটগত কারনে দশম নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে বিনাপ্রতিদ্বন্ধিতায় এমপি নির্বাচিত হন জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মোহাম্মদ নোমান। তিনি পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের উপদেষ্টাও। তবে এবারও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট অটুট থাকলে জাতীয়পার্টিকে নিয়ে ভয় তাঁদের (আ.লীগ)।

জানা গেছে, জাতীয় সংসদের ২৭৫ নম্বরের এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৯ জন। এরমধ্যে পুরুষ এক লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ এবং নারী ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৫৯ জন। নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই আসনটি আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। কারন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দুইবার এ আসন থেকে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। পরে অবশ্য তিনি দুইবারই আসনটি ছেড়ে দেন। সম্প্রতি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা নিজেদেরকে শক্তিশালী দাবি করলেও ভোটের হিসেবে এখনো তারা পিছিয়ে রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সরোজমিনে দেখা যায়, আসনটি থেকে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপি নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ উল্লাহ। পরের ৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ৯৬ সালের উপ-নির্বাচনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদকে ছেড়ে দেয়া হয়। তখন বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হারুনুর রশিদ। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার ছেড়ে দেয়া আসনে বিজয়ী হন জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল খায়ের ভূঁইয়া। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও আবুল খায়ের ভূঁইয়া নৌকাকে হারান। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেয়নি। তখন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয় ডা.এহসানুল কবির জগলুলকে। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক। পরে জোটগত কারনে জাতীয় পার্টিকে আসনটি আওয়ামী লীগ ছেড়ে দেয়। দলীয় সিদ্ধান্তে এহসানুল কবির জগলুল মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বিনাপ্রতিদ্বন্ধিতায় জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মোহাম্মদ নোমান এমপি নির্বাচিত হন। সাবেক এ ছাত্র নেতা জনগনের কাছাকাছি গিয়ে সজ্জন হিসেবে খ্যাতিও পেয়েছেন।
মোহাম্মদ নোমান বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকার রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনার ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। আমার সততা দিয়ে দলমত নির্বিশেষে জনগনের সমঅধিকার নিশ্চিত করে আমি জনসমর্থন তৈরী করেছি। নিজে যেমন চাঁদাবাজি করিনি, তেমনি কোন চাঁদাবাজও সৃষ্টি করিনি। জনগন আমার সঙ্গে আছেন, তারাই আমাকে বিজয়ী করবেন।
আওয়ামী লীগ
এ আসনের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একাধিক প্রার্থী রয়েছে। তার নিজেরা নিজেদের প্রচারণা নিয়ে ব্যস্ত। এনিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে দন্ধ। যার কারনে সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা বিপাকে রয়েছেন। তবে নৌকা প্রতিক বিজয়ী করতে দল থেকে নির্বাচিত প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন থাকবে সকলের এমটা প্রতিশ্রুতি অনেকেরই।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুল দলে নতুন এসেছে। তাকে ঠেকাতে দলের সকল নেতারা একাট্টা। অন্যদিকে বিএনপিতে ভরসা একমাত্র খায়ের ভূঁইয়া।
আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন- কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক হারুনুর রশিদ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সহ-সভাপতি ডা. এহসানুল কবির জগলুল, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন, কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ আলী খোকন ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য শামছুল ইসলাম পাটওয়ারী।
শামছুল ইসলাম পাটওয়ারী বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই আমার রাজনীতি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নিজেক উজ্জ্বেবিত করছি। শেখ হাসিনার নির্দেশে সকল আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিচ্ছি। আমি একজন মনোনয়ন প্রত্যাশী।
নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন বলেন, নেতাকর্মীদের পিছনে সময় দিয়ে দলকে সুসংগঠিত করেছি । লক্ষ্মীপুরের সবকয়টি আসনে নৌকার প্রতীক বিজয়ী করতে নেতাকর্মীদের মাঠে থাকতে নির্দেশ দিয়েছি। লক্ষ্মীপুর-২ আসনে দলকে চাঙ্গা করতে আমি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছি। এ আসনে আমি মনোনয়ন প্রত্যাশি।
এহসানুল কবির জগলুল বলেন, তৃনমূলের ছাত্রলীগের মাধ্যমে আমার রাজনীতি শুরু। এরপর পেশাজীবি সংগঠন এবং সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছি। এলাকার দেড় শতাধিক ছেলেমেয়েকে চাকুরির ব্যবস্থা করে দিয়েছি। দল আমাকে মনোনয়ন দেবো বলে বিশ্বাস রাখছি।
মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, আমি দলের দুঃসময়ে আওয়াম লীগের নেতাকর্মীদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করেছি। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আসনটি উপহার দিতে পারবো।
সাবেক এমপি হারুনুর রশিদ বলেন, আওয়ামী লীগের এ নয় বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে,স্বাধীনতার পরে আর এত বেশী উন্নয়ন হয়নি। নেত্রী যাকেই মনোনয়ন দেয়, আমরা তার হয়ে কাজ করবো। আমি এমপি থাকাকালে যে অবদান রেখেছি এবং দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছি সে কারনে দল আমাকে মনোনয়ন দিবে বলে মনে করছি।
এছাড়া সম্প্রতি কুয়েত প্রবাসী ব্যবসায়ী এনআরবি ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুল, বাশমী ট্রেড ইন্টার ন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইদুল বাকিন ভূঁইয়া ও সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী সালাহ উদ্দিন রিগ্যান আলাদা সংবাদ সম্মেলন করে প্রার্থীতা ঘোষণা করেছেন। এরপর থেকে তারা নির্বাচনী এলাকার বিভিন্নস্থানে সরকারের সাফল্যের বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।
বিএনপি
মনোনয়ন পেতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা তৎপর থাকলেও হামলা-মামলা ও পুলিশী হয়রানির শিকার বিএনপি। এ কারনেই প্রকাশ্যে প্রচার-প্রচারণা নেই। তবে আসনটিতে রয়েছে বিএনপির জনসমর্থন। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে বিএনপি।
সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা ক্ষমতার সময়ে সুফল ভোগ করা নেতাদের থেকে অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এক সময়ের জনপ্রিয় নেতাদের রাজনীতিতে কোনঠাসা করে রাখার কারনে তৃনমূলে যেন ক্ষোভের আগুনে পুড়ছে দলটি।
বিএনপি থেকে জেলা কমিটির সভাপতি আবুল খায়ের ভূঁইয়া, সাধারণ সম্পাদক সাহাবুদ্দিন সাবু ও খালেদা জিয়ার প্রধান নিরাপত্তা সমন্বয়কারী কর্নেল (অব.) আবদুল মজিদ মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।
সাহাবুদ্দিন সাবু বলেন, নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে আমি সকল আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছি। প্রাণে হত্যার জন্য র্যাব আমাকে গুলি করেছে। তবুও আমি দলের আদর্শচ্যূাত হইনি। সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্য আমি দলকে সংগঠিত রেখেছি। ত্যাগ ও শ্রমের মূল্যায়ন করে আমাকে মনোনয়ন দিবে বলে আমি আস্থা রাখি।
সাবেক এমপি আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, জেলা ও উপজেলার সকল স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ ও পুলিশ আমাদের নেতাকর্মীদেরকে হামলা-মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। তারা আমাদেরকে ঘরোয়া অনুষ্ঠানও করতে বাধা দিচ্ছে। শান্তিপূর্ণ নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জেলার চারটি আসনেই বিএনপিকে বিজয়ী করবে জনগন।