কমলনগর-রামগতিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সাড়ে তিন কোটি টাকার ক্ষতি

প্রতিবেদক : এমএন/ এমএস
প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট, ২০২০ ১০:৩৮ অপরাহ্ণ

মেঘনা নদীর দুই দফার অস্বাভাবিক জোয়ারে উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরের কমলনগর ও রামগতি উপজেলায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার প্রভাবে মেঘনার জোয়ার স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় ফুট বেড়ে দুই উপজেলার নিম্নাঞ্চলীয় এলাকাগুলো প্লাবিত হলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। এতে সহস্রাধিক পুকুর ও ঘেরের প্রায় দুই কোটি ৭০ লাখ টাকার মাছ জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে। জোয়ারে ভেসে ও পানিতে মারা গেছে হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগলসহ প্রায় ৮০ লাখ টাকার গবাদিপশুর।

জানা গেছে, পূর্ণিমার প্রভাবে গত ৫ আগস্ট প্রথম দফায় এবং অমাবস্যার প্রভাবে গত ১৯ আগস্ট থেকে দ্বিতীয় দফায় মেঘনার জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় ফুট বেড়ে যায়। এতে নদীর তীরবর্তী কমলনগর উপজেলার মতিরহাট, নাছিরগঞ্জ, কাদির প-িতেরহাট, চরজগবন্ধু, মাতাব্বরহাট, লুধুয়া ফলকন ও পাটারীরহাট এবং রামগতি উপজেলার বালুরচর, সুজনগ্রাম, জনতা বাজার, মুন্সীরহাট, সেবাগ্রাম, চরআলগী, বড়খেরী, চরগাজী, চরগজারিয়া, চর মুজাম্মেল ও তেলিরচর এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। অস্বাভাবিক এ জোয়ারে অসংখ্য পুকুর ও ঘেরের মাছ পানিতে ভেসে গিয়ে মৎস্য চাষীরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হন। হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগলসহ গবাদিপশু জোয়ারে ভেসে ও মারা গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন হাজারো মানুষ।

রামগতি উপজেলার চর রমিজ এলাকার মৎস্য চাষী মো. শরিফ, চর আলেকজান্ডার এলাকার মিনার উদ্দিন, চর আব্দুল্লাহ এলাকার আলী আজগর ও আবুল কাশেম জানান, দু’দফার অস্বাভাবিক জোয়ারে তাদের পুকুর ও ঘেরের লাখ লাখ টাকার মাছ পানিতে ভেসে গিয়েছে। জাল দিয়ে মাছ আটকে রাখার চেষ্টা করেও কোনো লাভ হয়নি।

কমলনগর উপজেলার চরফলকন এলাকার মৎস্যচাষী সিরাজুল ইসলাম জানান, ব্যাংকসহ বিভিন্নজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিকভাবে মাছচাষ করে আসছেন। মেঘনার এ অস্বাভাবিক জোয়ারে তার তিনটি ঘেরের প্রায় ২০ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে।

চরলরেন্স এলাকার তাজ লেয়ার মুরগি খামারের স্বত্তাধিকারী মো. ওসমান জানান, জোয়ারের পানিতে তার খামার ডুবে প্রায় পাঁচ হাজার মুরগি মারা যায়। এতে তিনি প্রায় ২৮ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির শিকার হন।

চরফলকন এলাকার পোল্ট্রি খামারী ফিরোজ আলম জোয়ারের পানিতে তার খামারের দুই শতাধিক পোল্ট্রি মোরগ মারা গেছে বলে জানান।

কমলনগর উপজেলার চরফলকন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ ও রামগতি উপজেলার চরআলগী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন লিটন চৌধুরী জানান, মেঘনার ভাঙনের মুখেপড়ে নদীতে বিলীন হওয়া বেড়িবাঁধ পুনর্নির্মিত না হওয়ায় জোয়ার বাড়লেই দু’উপজেলার নদী তীরবর্তী এলাকায় সহজেই পানি প্রবেশ করে প্লাবিত হয়ে যায়।

তারা জানান, গত চার যুগের মধ্যে এবারের জোয়ারের পানি সর্বোচ্চ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ সময় ক্ষতিগ্রস্তদের ঘুরে দাড়াতে আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ জোয়ার থেকে রক্ষায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তারা।

রামগতি উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন জানান, জোয়ারের পানিতে উপজেলার ৬৯৩টি পুকুর ও খামারের মাছ ভেসে গিয়ে দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

কমলনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, উপজেলার নদী তীরবর্তী এলাকার ৬২৯টি পুকুর ও ঘের থেকে এক কোটি ২০ লাখ টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত মাছচাষীদের তালিকা তৈরি করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে দেওয়া হয়েছে।

কমলনগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ডা. কাউসার ই-হুদা জানান, প্রবল জোয়ারে উপজেলায় দুইটি গরু, চারটি ছাগল, ছয় হাজার ৭৫৬টি হাঁস ও ১২ হাজার ২১৭টি মুরগি মারা যায়। এতে প্রায় ৭০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার কথা উল্লেখ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তারা তালিকা দিয়েছেন।

অপরদিকে রামগতি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জোয়ারে রামগতি উপজেলায় ১২টি ভেড়া, ১০টি মহিষ, এক হাজার ১৪০টি হাঁস ও ৪৫২টি মুরগী ভেসে ও মারা গিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

রামগতি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও কমলনগর উপজেলার অতিরিক্তি দায়িত্বে থাকা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. রিয়াদ হোসেন জানান, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা প্রদান করা হবে।

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন