সফল হবেন তো বেগমরা!
খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। বিন্দু থেকে সিন্ধু গড়েছেন কয়েকজন উদ্যোক্তা। তাদের হাতে স্বল্প পুঁজিতে গড়ে ওঠা লাখ টাকা টার্নওভারের প্রতিষ্ঠান এখন কয়েক হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যবসা করছে। তবে সম্প্রতি কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এসেছেন এতদিন ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলের আড়ালে থাকা মানুষগুলো। প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তার প্রয়াণের পর তাদের সহধর্মিণীরাই হাল ধরেছেন আবদুল মোনেম লিমিটেড, যমুনা গ্রুপ ও ট্রান্সকম গ্রুপের। অন্দরমহল থেকে এসে নেতৃত্ব দেয়া এসব মানুষ পারিবারিক ঐক্য কতটা ধরে রাখতে পারবেন এবং ব্যবসাকে সামনের দিকে কতটুকু এগিয়ে নিতে পারবেন, তা নিয়ে চলছে বিচার-বিশ্লেষণ। তবে ব্যবসা নিয়ে কাজ করেন এমন গবেষক ও অর্থায়নকারী ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর এসব কনগ্লোমারেট গ্রুপের ব্যবসা কতটা এগিয়ে যাবে, তা দেখার জন্য আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।
দেশের নির্মাণ খাতের অন্যতম পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেড। এ গ্রুপের অধীনে রয়েছে এক ডজনেরও বেশি প্রতিষ্ঠান। ১৯৫৬ সালে মাত্র ২০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেড গড়ে তোলেন আবদুল মোনেম। এরপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি এ কোম্পানিকে বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণ শিল্পের সামনের সারিতে নিয়ে এসেছেন। তার হাত ধরেই প্রতিষ্ঠা পাওয়া এএমএল কনস্ট্রাকশনস লিমিটেড এখন দেশের অন্যতম শীর্ষ কনস্ট্রাকশনস ফার্ম।
আবদুল মোনেম জীবিত থাকা অবস্থায়ই তার বড় ছেলে মাঈনুদ্দিন মোনেম ও ছোট ছেলে মহিউদ্দিন মোনেম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভাগাভাগি করে দেখাশোনা করে আসছিলেন। আবদুল মোনেমের মৃত্যুর পর এখন ব্যবসা পরিচালনা ও হিস্যা নিয়ে পারিবারিক মতপার্থক্য সামনে এসেছে। আরো জটিল পরিস্থিতি এড়াতে এবং সৃষ্ট জটিলতার সমাধানে সারা জীবন অন্দরমহলে থাকা আবদুল মোনেমের স্ত্রী মেহেরুননেসা হাল ধরেছেন ব্যবসার। যদিও স্বামী জীবিত থাকতে কখনই সম্মুখসারি থেকে ব্যবসার নেতৃত্ব নিয়ে ভাবতে হয়নি তাকে।
দেশের আবাসন, হোয়াইট গুডস ও মিডিয়া খাতে ব্যবসা রয়েছে যমুনা গ্রুপের। ১৯৭৪ সালে যমুনা ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং কো. লিমিটেড নামে যাত্রা করে এ কনগ্লোমারেট। পরের বছর ১৯৭৫ সালে ইলেকট্রিক্যাল অ্যাকসেসরিজ প্রস্তুতকারক হিসেবে আবির্ভূত হয় এ খাতের পথিকৃৎ দাবিদার যমুনা গ্রুপ। বর্তমানে যমুনা গ্রুপের আওতায় আছে ২৪টি প্রতিষ্ঠান। পরিবারের সদস্যদের নিয়েই প্রতিষ্ঠানটির একক কর্তৃত্বে ছিলেন প্রয়াত নুরুল ইসলাম বাবুল। সম্প্রতি তার মৃত্যুর পর গ্রুপের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে এসেছেন স্ত্রী সালমা ইসলাম। আর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আছেন তাদের সন্তান শামিম ইসলাম।
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম বড় নাম ট্রান্সকম গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্যোক্তা ছিলেন লতিফুর রহমান। ১৯৬৬ সালে চাঁদপুরে পারিবারিক পাটকলের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সেখানে নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে রহমান পরিবারের মূল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ডব্লিউ রহমান জুট মিল জাতীয়করণ হয়। এর পরের বছরই ট্রান্সকম গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন লতিফুর রহমান। ট্রেডিং দিয়ে যাত্রা করা ট্রান্সকম গ্রুপের এখন ব্যবসা রয়েছে ইলেকট্রনিক পণ্য, ওষুধ, চা শিল্প ও গণমাধ্যমেও। এছাড়া আন্তর্জাতিক ফুড চেইনের ফ্র্যাঞ্চাইজিসহ কোমলপানীয়র ব্যবসাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। বর্তমানে গ্রুপটির ১৪টি প্রতিষ্ঠানে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে।
জীবিত থাকতেই একক কর্তৃত্বে ব্যবসার সবকিছু সামলেছেন লতিফুর রহমান। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনিই ছিলেন ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান। গত ১ জুলাই লতিফুর রহমানের মৃত্যুর পর ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আসেন তার স্ত্রী শাহনাজ রহমান। যদিও আগে তাকে কখনো গ্রুপের ব্যবসায় নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়নি। তবে বেশ আগে থেকেই গ্রুপের ওষুধ ব্যবসা এসকায়েফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন তাদের কন্যা সিমিন রহমান।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পারিবারিক ব্যবসার নেতৃত্বের পালাবদলের জন্য পূর্ব প্রস্তুতি লক্ষ করা গেলেও বাংলাদেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রস্তুতির ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। আবার প্রস্তুতি থাকলেও তাদের যোগ্য উত্তরসূরিদের মধ্যে পেশাদারিত্বের ঘাটতির কারণে মসৃণভাবে ব্যবসা পরিচালনায় নানা অন্তরায় সামনে চলে আসছে। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ভূমিকা রাখতে হচ্ছে অন্দরমহলকে। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তার স্ত্রী বা উত্তরসূরিদের মাকেই নেতৃত্বের হাল ধরতে হচ্ছে।
দেশের বড় কনগ্লোমারেটগুলোয় নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে অন্দরমহলের ভূমিকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, শ্রদ্ধার মানসিকতা থেকেও বাংলাদেশে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব আসছে অন্দরমহল থেকে। অন্দরমহল থেকে নেতৃত্ব আসার এ চিত্র শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিকও। তবে ব্যবসাকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে এগিয়ে নিতে হলে পরিবার এবং পেশাদার কর্মী দুইয়ের সমন্বয় থাকতে হবে। আর ব্যবসা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এগিয়ে নিতে অবশ্যই উত্তরসূরিদের চিন্তাভাবনা শেয়ারহোল্ডার থেকে স্টেকহোল্ডার পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। বলতে চাচ্ছি, শুধু কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার—এ ভাবনা থেকে ব্যবসা পরিচালনা না করে সব স্টেকহোল্ডার অর্থাৎ কর্মী থেকে শুরু করে পণ্য ও সেবার ভোক্তাকে অন্তর্ভুক্ত করে ব্যবসা নিয়ে ভাবতে হবে।
এদিকে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর শুরু মূলত ট্রেডিং ব্যবসা থেকে। এরপর পর্যায়ক্রমে তারা উৎপাদনমুখী শিল্পে ধাবিত হয়েছেন। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তার একচ্ছত্র কর্তৃত্বেই ছোট থেকে বড় হয়েছে অধিকাংশ পারিবারিক ব্যবসা। অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা পারিবারিক ব্যবসার বৈশ্বিক ইতিহাস বিবেচনায় নিয়ে নিজেদের উত্তরসূরিদের প্রস্তুত করেছেন। এখন পরিবারের সদস্য ও পেশাদার কর্মী দুইয়ের সমন্বয়ে ব্যবসা এগিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছেন। তবে সম্প্রতি কিছু প্রতিষ্ঠানে অন্দরমহল থেকে নেতৃত্ব আসার ক্ষেত্রে অর্থায়নকারীরাও পরোক্ষ ভূমিকা রাখছেন। তারা এটা করছেন বিনিয়োগ মসৃণ করার স্বার্থে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশে ব্যক্তিশাসিত কনগ্লোমারেটগুলো ছোট থেকে বড় হয়েছে। শুরু করেছে ট্রেডার হিসেবে, ট্রেডিংয়ে ভালো করার পর ছোট একটা কারখানা এবং এর ধারাবাহিকতায় বড় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর। প্রায় সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান এভাবেই হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উদ্যোক্তারা একচ্ছত্র কর্তৃত্ব করেছেন। তারা ব্যবসার জন্য সন্তানদেরও শিক্ষিত করেছেন। এখনো অনেকে আছেন যারা একচ্ছত্রভাবে ব্যবসায় কর্তৃত্ব করছেন। ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা চলে গেলে বিরোধ এড়াতে সন্তানরা মাকে নিয়ে আসেন রেফারির ভূমিকা পালন করতে। সন্তানদের সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বস্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। আসলে উদ্যোক্তাদের অনুধাবন করা উচিত যে জীবনাবসান হবেই। কষ্ট করে একটা গড়ে তোলা কোম্পানি টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এক্ষেত্রে ফাউন্ডেশন গঠনের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা একটা ভালো পন্থা হতে পারে। বৈশ্বিক উদাহরণগুলোও এমন শিক্ষাই দিচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, দেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিংহভাগই ব্যক্তি বা পারিবারিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। এ ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ৮৬ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডান অ্যান্ড ব্র্যাডস্ট্রিটের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশই পারিবারিক। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) এক প্রতিবেদন বলছে, অনেক ক্ষেত্রে শূন্য থেকে শুরু করলেও বর্তমানে আয় শতকোটি ডলার ছাড়িয়েছে এমন পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও আছে বাংলাদেশের।