লক্ষ্মীপুরে নিহত জসিমের পরিবারে আতঙ্ক : সাক্ষ্য হবে কবে ?

প্রতিবেদক : এমএন /আর
প্রকাশিত: ২২ ডিসেম্বর, ২০২১ ৬:২৩ অপরাহ্ণ

কাজল কায়েস: লক্ষ্মীপুরে ছাত্রলীগ নেতা মেহেদী হাসান জসিম (৩২) হত্যা মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশীট) দাখিলের প্রায় ৮ বছরে সাক্ষ্য শুরু হয়নি। তাঁকে ২০১৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত গভীর রাতে ঘরের ভেতরে ডুকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

 

জসিম সদর উপজেলার কফিল উদ্দিন ডিগ্রি কলেজ ছাত্রলীগের সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক ছিল।

 

২০১৪ সালের ২৭ মার্চ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা লক্ষ্মীপুর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছিলেন।

 

এরপর থেকে মঙ্গলবার  (২১ ডিসেম্বর) পর্যন্ত এ মামলায় একজনের সাক্ষ্যও নেওয়া হয়নি।

এ হত্যার বিচার পাবেন কিনা-তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন জসিমের বৃদ্ধ বাবা-মা।  ছেলের কথা মনে পড়লেই তাঁরা এখনো ডুকরে কেঁদে ওঠেন। জীবিত থাকা অবস্থায় তারা বিচার দেখে যেতে চান। মামলার আসামিদের ভয়ে স্বাভাবিক জীবন-যাত্রা ব্যাহতের পাশাপাশি ছেলে-মেয়েরাও এখন আর বাড়িতে আসছে না বলে জানিয়েছেন নিহতের অশীতিপর বাবা মফিজ উল্যা।

 

তবে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁশুলী জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, মহামারি করোনাসহ নানা কারণে মামলাটির সাক্ষ্য শুরু হয়নি। আগামী ৩১ ডিসেম্বর তারিখ রয়েছে। যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমান দিতে পারলে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা যাবে।

মামলার এজাহার ও থানা পুলিশ সূত্র জানায়, সদর উপজেলার দত্তপাড়ার শ্রীরামপুর গ্রামের মফিজ উল্যার সঙ্গে একই বাড়ির মোবারক উল্যা ও আলী হোসেন বাচ্চুদের জমি নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। এর জের ধরে মোবারকরা ২০১৩ সালের ৭ জানুয়ারি মফিজ ও তার পরিবারের সদস্যদের মারধর করে। এ ঘটনায় থানায় পাল্টাপাল্টি মামলা হয়। এরপর থেকে মফিজের মামলাটি প্রত্যাহার করার জন্য হুমকি দেয়, না করলে হত্যা করা হবেও হুমকি দেওয়া হয়। এজন্য মফিজ ও তার পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে না যেতে পেরে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আত্মগোপনে থাকতেন। একপর্যায়ে প্রতিপক্ষ মোবারকদের করা মামলাটি উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. নুরনবী তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল  করেন। অভিযোগপত্রে মফিজের ছেলে হাসান জসিমের নাম বাদ দেওয়ায় মোবারকরা চরম ক্ষিপ্ত হয়। একারণে জসিম ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে সদর উপজেলার ভাঙ্গাখাঁ ইউনিয়নের রাধাপুর গ্রামে আত্মীয় গোলাম মাওলার বাড়িতে আত্মগোপনে যায়। জসিমের সঙ্গে তার বড় ভাই আবদুল হাই ও  গোলাম মাওলার ভাই মাসুদ একই কক্ষে ঘুমিয়ে ছিল। ওইদিন দিবাগত গভীর রাতে আসামীরা জানালার গ্রীল ভেঙ্গে ঘরে ডুকে। এসময় তারা জসিমের বুকে গুলি করে। তাকে বাঁচানোর জন্য অন্যরা এগিয়ে আসলে আসামিরা গুলি করার হুমকি দিয়ে তাদের পিটিয়ে আহত করে। পরে জসিমকে উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় পরদিন মফিজ বাদী হত্যা থানায় মোবারকসহ ১২ জনের নাম উল্লেখ ও অচেনা আরো ১০-১২ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলার নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, সবশেষ ২০১৪ সালের ২৭ মার্চ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ল²ীপুর সদর থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবু নাছের আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে সাক্ষ্য-প্রমানে মোবারক উল্যা, আলী হোসেন বাচ্চু, অজি উল্যা, কবির হোসেন রিপন, হিজবুর রহমান স্বপন, আবুল কাশেম, সফিক উল্যসহ ১০ জনের  বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এরমধ্যে আসামি আবুল কাশেম ও অজি উল্যা মারা গেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জসিম হত্যার ঘটনা পরিকল্পিত। তখন আলোচিত শামীম ও লাদেন বাহিনীর সন্ত্রাসীরা এ হত্যাকান্ডে অংশ নিয়েছিল। তারা জসিমদের প্রতিপক্ষ হয়ে ভাড়া এসেছিল। জনশ্রæতি রয়েছে, মফিজদের বিপুল সম্পত্তি আয়ত্বে নিতে ৩০-৩৫ লাখ টাকার বিনিময়ে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। তবে বাহিনী প্রধান শামীম, লাদেন এবং তাদের অনেক সহযোগি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছেন।

নিহতের ভাই মিজানুর রহমান বলেন, ৯১ সাল থেকেই আমরা অত্যাচার নির্যাতনের শিকার। সবসময়ই পরিবারের সদস্যদের চরম আতঙ্কে  থাকতে হয়। হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে রয়েছে, তারা আমাদের ক্ষেতের ধানও লুটে নিয়েছে।

মামলার বাদী মফিজ উল্যা বলেন,আমার ছেলেকে হত্যা করেও সন্ত্রাসীরা ক্ষান্ত হয়নি। তারা আমার বাড়িতে হামলা, লুটপাট করেছে। আগে আমাকে অপহরণ করেছে, আরেক ছেলেকে গুলি করেছে। জীবিত থাকতে ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই। আসামিদের ভয়ে আমার ছেলে-মেয়েরাও বাড়িতে আসতে পারে না।

 

মামলার আসামি মোবারক উল্যা বলেন, আমরা হত্যা মামলায় জামিনে আছি। আইনিভাবে আমরা মামলাটি মোকাবেলা করবো। কাউকে হুমকি বা ভয়-ভীতি দেখানোর অভিযোগ সত্য নয়।

বাদীর আইনজীবি রাসেল মাহমুদ ভূঁইয়া মান্না বলেন, সাক্ষী হাজীর করার জন্য আদালত নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে বাদীসহ অন্য সাক্ষীদের আদালতে সাক্ষ্য দেবো।

জানতে চাইলে দত্তপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আহসানুল কবির রিপন বলেন, মফিজ ও তার পরিবারের সদস্যরা নিবেদিত আওয়ামীলীগ কর্মী। তাঁরা বিএনপির সন্ত্রাসীদের হামলা-মামলাসহ নির্যাতনের শিকার হয়েছে। চলতি বছরও তাঁদের বাড়ির ধান লুটের চেষ্টা হয়, আমি তা উদ্ধার করে দিয়েছি।

এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁশুলী জসিম উদ্দিন বলেন, অধিকাংশ হত্যা মামলার সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে আদালতে আসতে চায় না। এরমধ্যে করোনার কারণে কার্যক্রম স্থবির ছিল। এখন ৩১ ডিসেম্বর স্বাক্ষীর তারিখ নির্ধারণ রয়েছে। যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমান দিতে পারলে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা যাবে।

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন