যশোরে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ২ জনের দাফন পাশাপাশি
কেন্দ্রীয় কারাগারে দুই নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। সোমবার (৪ অক্টোবর) রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে তাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। ফাঁসি কার্যকরের পর একসাথে জানাজা শেষে মিন্টু ও আজিজকে নিজ গ্রামে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৫ অক্টোবর) সকালে জানাজার পর চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার রায়লক্ষ্মীপুরে নিজ গ্রামের গোরস্তানে তাদের দাফন করা হয়। তাদের জানাজায় এলাকার অসংখ্য মানুষ অংশ নেয়। দাফনের আগ মুহূর্তে প্রবল বৃষ্টি দাফন কাজে ব্যাহত হয়েছে।
সকালে আশপাশের গ্রামের অনেক নারী-পুরুষ মিন্টু ও আজিজের বাড়িতে আসেন। কেউ কেউ দেখতে যায় তাদের কবর।
এর আগে, অন্য সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাত ১২টার দিকে দুইজনের মরদেহ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে আলাদা আলাদা অ্যাম্বুলেন্সে পুলিশ প্রহরায় দুইজনের মরদেহ নিয়ে রওনা দেন স্বজনরা। রাত আড়াইটার দিকে তারা আলমডাঙ্গার নিজগ্রাম রায়লক্ষ্মীপুর পৌঁছান। আজিজুল ও মিন্টুর দাফনের জন্য গ্রামের মসজিদে নির্ধারিত সময়ের ১০ মিনিটেই আগেই হয়ে যায় ফজরের জামাত।
এরপর মসজিদের সামনের ফাঁকা চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় জানাজা। আজিজ ও মিন্টুর মরদেহ সামনে রেখে একইসাথে জানাজা পড়ানো হয়।
গ্রামবাসীরা জানায়, আজিজুলের মামাতো ভাই ঝিনাইদহের সাধুহাটি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান জানাজার নামাজে ইমামতি করেন। সকাল হওয়ার সাথে সাথে গ্রামের গোরস্তানে পাশাপাশি কবরে তাদের দাফন করা হয়।
স্থানীয় খাসকররা ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান রুন্নু জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে মরদেহ কবরে নামানোর সাথে সাথে শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। এ কারণে দাফনকাজে কিছুটা ব্যাহত হয়।
বিচারিক ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে টানা ১৮ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নিহতদের স্বজনরা।
ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান জানান, পরিবারের সাথে শেষ সাক্ষাতের সময় কালু ও আজিজুল সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে কাঁদতে থাকে। দুইজনের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেজ আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছে কারা কর্তৃপক্ষ।
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার তুহিন কান্তি খান জানান, সোমবার রাত ১০টা ৪৫ মিনিট ও ১০ টাকা ৫০ মিনিটে আজিজ ও কালুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি, সিভিল সার্জন, চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন।
তিনি আরো বলেন, চুয়াডাঙ্গার আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দণ্ডপ্রাপ্ত দুইজনের ফাঁসি কার্যকরের জন্য কয়েক দিন আগে থেকেই আমরা প্রস্তুতি নিই। শনিবার যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে শেষবারের মতো স্বজনরা তাদের সাথে দেখা করেন। তাদের দুইজনের শেষ ইচ্ছা অনুযারী দুই পরিবারের অর্ধশতাধিক মানুষের সাথে দেখা করাই।
এছাড়া তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী শনিবার গরুর কলিজা ও ইলিশ মাছ খাওয়ানো হয়। রোববার গ্রিল ও নান রুটি আর সোমবার মুরগির মাংস, দই আর মিষ্টি খাওয়ানো হয়।
জানা যায়, ২০০৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর আলমডাঙ্গা থানার জোড়গাছা গ্রামের কমেলা খাতুন ও তার বান্ধবী ফিঙ্গে বেগমকে ধর্ষণের পর হত্যা করে মরদেহ ফেলে রাখা হয় রায়লক্ষ্মীপুর মাঠে। এ ঘটনায় পরদিন নিহত কমেলা খাতুনের মেয়ে নারগিস বেগম আলমডাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করে। মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ওই দুইজনসহ চারজনকে আসামি করা হয়। অপর দুইজন হলেন একই গ্রামের সুজন ও মহি।
মামলা বিচারাধীন অবস্থায় মারা যান আসামি মহি। ২০০৭ সালের ২৬ জুলাই চুয়াডাঙ্গার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল সুজন, আজিজ ও মিন্টুকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এরপর আসামিপক্ষের লোকজন হাইকোর্টে আপিল করেন। চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ দুই আসামির রায় বহাল রাখেন এবং আরেক আসামি সুজনকে খালাস দেন। ২০ জুলাই যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান খালাসপ্রাপ্ত সুজন।
২০০৭ সালের ১০ আগস্ট চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগার থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই দুই আসামিকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এতদিন এখানেই বন্দি ছিল তারা।