নাটোরের শিশু হত্যা বেড়েছে, আতংকিত এলাকাবাসি
নাজমুল হাসান, নাটোর প্রতিনিধি : নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলায় একের পর এক শিশু হত্যার ঘটনা ঘটছে। এতে চরম আতংক আর নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে অভিভাবক আর এলাকাবাসি। বড়দের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, প্রতিহিংসা আর লালসার বলি হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা।
গত কয়েক মাসের ব্যবধানে তিনটি শিশু হত্যাকান্ডের ঘটনায় প্রশাসনও নড়েচরে বসেছে। পুলিশ বলছে শিশু হত্যার ঘটনা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। শিশু হত্যা রোধে নেওয়া হয়েছে নানা প্রদক্ষেপ।
জানা যায়, গত ২০ ডিসেম্বর গুরুদাসপুর উপজেলার বিলশা দাখিল মাদ্রাসার ২য় শ্রেণীর ছাত্রী খাদিজা খাতুন প্রতিদিনের মতো বাড়ির পাশে খেলাতে গিয়ে নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় পরদিন শিশুটির চাচা মোর্শেদ আলী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ তল্লাশি করে খাদিজার কোনো সন্ধান পায়নি।
পরে নিখোঁজের দুদিন পর বাড়ির পাশের পুকুরে বস্তাবন্দি খাদিজার মৃহদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় খাদিজার বাবা মনিরুল ইসলাম বাদী হয়ে প্রতিবেশী বাদল ভক্তি ও তার স্ত্রী নাজমা বেগম, বাদলের ভাতিজা নজরুল ইসলামসহ ৬ জনকে আসামী করে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ওই মামলায় বাদল ভক্তি তার স্ত্রী নাজমা বেগম ও বাদলের ভাতিজা নজরুল ইসলামকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠায়। ধারণা করা হচ্ছে ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে খাদিজাকে।
খাদিজার বাবা মনিরুল ইসলাম এবং চাচা মুর্শিদ আলম জানান, পূর্ব বিরোধের জের ধরে প্রতিশোধ নিতে প্রতিবেশী বাদল ভক্তি ও তার স্ত্রী নাজমা বেগমের যোগসাজসে পরিকল্পিতভাবে খাদিজাকে নির্মমভাবে হাত পা ভেঙ্গে অমানুষিক নির্যাতন কর্ েহত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকান্ডের দৃষ্টান্তমূলক শান্তি চান তারা।
এর আগে গত ১১ই সেপ্টেম্বর উপজেলার জুমাইনগর মোল্লাবাজার এলাকায় মমতাজ উদ্দিনের দেড় বছরের শিশু আহম্মদ আলী নিখোঁজ হয়। এর দুদিন পর তাদের বাড়ি থেকে তিনশ গজ দুরে ডোবা থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর নিহত শিশুর বাবা বাদি হয়ে চার প্রতিবেশী লিপি খাতুন, মকুল, মজিবর ও কোহিনুরকে আসামি করে আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করলে পুলিশ চারজনকে আটক করে।
নিহত শিশু মোহাম্মদ আলীর বাবা মমতাজ উদ্দিন আক্ষেপের স্বরে বলেন, ‘আমার মাসুম বাচ্চার কি অপরাধ ছিল? কেন তাকে প্রাণ হারাতে হলো? আমি কিচ্ছু চাইনা। অপরাধিদের ফাঁসি হোক এটাই আমার চাওয়া ।’
এছাড়াও চলতি বছরের ৫ মে একই উপজেলার চাঁচকৈড় বাজারপাড়া মহল্লার মোহন কুমার ঘোষের মেয়ে দৃষ্টি ঘোষ নিজ বাড়ির সামনে খেলাধূলার একপর্যায়ে হারিয়ে যায়। পরে নিখোঁজের পরদিন প্রতিবেশী প্রদীপ সরকারের বাড়ি থেকে শিশুটির বস্তাবন্দি মৃতদেহ উদ্ধার করে। পুলিশের অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসে শিশুটিকে ধর্ষনের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে তাকে বস্তাবন্দি করে একটি ট্রাংকের মধ্যে রাখা হয়েছিল। এ ঘটনায় দৃষ্টির বাবা বাদি হয়ে প্রদীপ সরকার, তার স্ত্রী সন্ধ্যা রানী এবং তাদের ছেলে হৃদয় সরকারকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরই প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত তিনজনকে আটক করে পুলিশ।

নিহত শিশু দৃষ্টি ঘোষের মা লক্ষী ঘোষ এবং বাবা মোহন কুমার ঘোষ দ্রুত বিচার আইনে দোষীদের শাস্তি কামনা করেন।
ইতিমধ্যে হত্যাকারীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসুচি পালন করেছে এলাকাবাসিও নিহতের স্বজনরা। একের পর এক হত্যার ঘটনায় চরম আতংক আর নিরাপত্তাহীনতায় দিনযাপন করছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান, জালাল উদ্দিন, দীল মোহাম্মদসহ একাধিক এলাকাবাসি জানান, নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, প্রতিহিংসা আর লালসার শিকার হয়ে অকালেই প্রাণ হারাচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। গুরুদাসপুরে পর পর তিনটি শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
একের পর এক শিশু হত্যার ঘটনায় অভিবাবক ও এলাকাবাসির মধ্যে চরম আতংক বিরাজ করছে। ভয়ে অনেকে শিশুদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় পাচ্ছে। সবার উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দুর করতে প্রশাসনের কার্যকরি হস্তক্ষেপ করছেন করেছেন তারা।
নাটোর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক জানান, মানুষের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে শিশু হত্যার মতো জঘন্য ব্যাপার ঘটছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এটা রোধ করা সম্ভব।
গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দীলিপ কুমার দাস জানান, শিশু হত্যার ঘটনাগুলো অধিক গুরুত্বের সাথে মনিটরিং করে দোষীদের আইনের আওতায় আনাসহ শাস্তি নিশ্চিতের জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। ইতিমধ্যে শিশু হত্যা প্রতিরোধে ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে।